হোলি আর্টিজান হামলা নিয়ে ডিএমপি কমিশনারের মন্তব্যে বিতর্ক: “বাংলাদেশে জঙ্গি নেই, আছে ছিনতাইকারী”

হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলার বর্ষপূর্তিতে ঢাকা (Dhaka) মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী (Sheikh Md. Sajjat Ali)-এর মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার মতে, “বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই, বাংলাদেশে আছে ছিনতাইকারী।”

হোলি আর্টিজান: বিভীষিকাময় রাত

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশান (Gulshan)-এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়ির হোলি আর্টিজান বেকারিতে (Holey Artisan Bakery) জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান (Bangladeshi-American) এবং ২ জন বাংলাদেশি।

হামলা ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এই ঘটনার দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস (ISIS), যদিও বাংলাদেশের গোয়েন্দারা এটিকে নব্য জেএমবি (Neo JMB)-র হামলা বলে জানান।

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে জঙ্গিবাদ নিয়ে ভিন্ন মত উঠে আসছে। কমিশনার সাজ্জাত আলী বলেন, “আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে, কিসের জঙ্গি?”

তিনি আরও বলেন, “হোলি আর্টিজানে কী হয়েছিল জানি না, তবে বাংলাদেশে পেটের দায়ে লোকে ছিনতাই করে, জঙ্গি বলে কিছু নেই।”

‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া ও হিযবুত তাহরীরের উত্থান

হামলায় নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে স্থাপিত ভাস্কর্য ‘দীপ্ত শপথ’ ক্ষমতা পরিবর্তনের পর ভেঙে ফেলা হয়। সেই স্থানে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর (Hizb ut-Tahrir)-এর পোস্টার লাগানো হয়। কারা বা কখন এটি ঘটিয়েছে তা নিয়ে কোনো সরকারি ব্যাখ্যা আসেনি।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সেনা অভিযান

ঘটনার রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়– নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম (উজ্জ্বল), মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম (পায়েল)।

এই হামলা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নাড়িয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়।

বিচার কার্যক্রম

গুলশান থানা (Gulshan Police Station)-য় দায়ের করা মামলায় তদন্ত শেষে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাতজনের ফাঁসির রায় দেয়। তবে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাই কোর্ট (High Court) সেই রায় পরিবর্তন করে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।

দণ্ডিতরা হলেন– জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন (র‌্যাশ), হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম (খালেদ) ও মামুনুর রশিদ রিপন।

জঙ্গি দমন ইউনিটের ভবিষ্যৎ

সিটিটিসি (CTTC) ইউনিট সম্পর্কে বর্তমান কমিশনার বলেন, “তাদের বলে দেওয়া হয়েছে– বাংলাদেশে জঙ্গি নেই, ছিনতাইকারীকেই এখন ধরতে হবে।”

গুম তদন্ত কমিশনের মত

গঠিত গুম তদন্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম বলেন, “সন্ত্রাসবাদ একটি বাস্তব হুমকি, হোলি আর্টিজান তার প্রমাণ। তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা মোকাবেলায় মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি। সরকার যদি এটিকে বিরোধী দমনচর্চার ঢাল বানায়, তবে তা রাষ্ট্র ও জনগণের বিশ্বাস ধ্বংস করে।”