প্রোটিন খাওয়া কতটা প্রয়োজন, কার জন্য কতটুকু যথাযথ? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

আমরা বাঙালির খাদ্যতালিকায় আমিষের প্রাধান্য স্পষ্ট, কিন্তু প্রোটিনের অতিরিক্ত গ্রহণ হতে পারে কিডনি, হৃদরোগ ও হজমের সমস্যার কারণ। ডা: শেখ মইনুল খোকন (Dr. Sheikh Moinul Khokon) সহ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স, ওজন ও শারীরিক অবস্থান অনুযায়ী প্রোটিনের পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি। এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো কোন রোগে কী ধরনের প্রোটিন খাবেন, এবং অতিরিক্ত প্রোটিনে কী কী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রোটিন খাওয়া কতটা প্রয়োজন, কার জন্য কতটুকু যথাযথ? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

অতিরিক্ত প্রোটিন ভালো নয়: সচেতন হোন পুষ্টিকর খাদ্য নির্বাচনেও

মোটাদাগে আমরা বাঙালি (Bengali) আমিষাশী—মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ আমাদের প্রিয় খাবারের তালিকায় শীর্ষে থাকে। অনেকেই মনে করেন, ভাত-রুটি কমিয়ে প্রোটিন বেশি খেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, যেমন খাদ্যে কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ জরুরি, তেমনি প্রোটিনও অতিরিক্ত গ্রহণে হতে পারে বিপদজনক।

প্রোটিনের ভূমিকা কী?

প্রোটিন হলো অ্যামিনো অ্যাসিড দ্বারা গঠিত একটি মৌলিক পুষ্টি উপাদান। এর কাজগুলো হলো:

  • **পেশি গঠন ও মেরামত ব্যায়ামের পরে পেশির টিস্যু মেরামতে সহায়ক
  • হরমোন ও এনজাইম তৈরি: হজম, বিপাকক্রিয়া ও অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রমে সহায়ক
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: সংক্রমণের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি
  • শক্তি সরবরাহ: যখন শরীরে কার্বোহাইড্রেট ও চর্বি কম থাকে, তখন শক্তির উৎস হয়

প্রোটিন পাওয়া যায় যেসব খাবারে

  • প্রাণীজ প্রোটিন: ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, দই, পনির
  • উদ্ভিজ্জ প্রোটিন: ডাল, বাদাম, ছোলা, সয়াবিন, কিনোয়া, মসুর ডাল

হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন (Human Aid Bangladesh Foundation) -এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ডা: শেখ মইনুল খোকন (Dr. Sheikh Moinul Khokon) বলেন, “একটি ডিমে ৬ গ্রাম প্রোটিন, এক ছটাক মুরগির মাংসে ১২ গ্রাম, আর মুগ ডালে ১৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে। তাই হিসেব করে খেতে হবে।”

দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা কত?

একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য দৈনিক প্রয়োজন হয় ওজন প্রতি ০.৮ গ্রাম প্রোটিন। অর্থাৎ, ৬০ কেজি ওজনের মানুষের প্রোটিন প্রয়োজন দিনে ৪৮ গ্রাম।

স্বাস্থ্য সমস্যায় প্রোটিন গ্রহণের নির্দেশনা

১. কিডনি রোগী

ডা. খোকনের মতে, “যাদের কিডনি সমস্যা আছে, তারা ওজন প্রতি ০.৬–০.৮ গ্রাম প্রোটিন খাবেন। ৬০ কেজি ওজনের কিডনি রোগীর জন্য ৩৬–৪৮ গ্রাম প্রোটিন যথেষ্ট।”

দুধ বিষয়ে সতর্কতা: “কিডনি রোগীরা দুধ খেতে পারেন, তবে সেটি ঘন না হওয়া উচিত। চাইলে দুধে পানি মিশিয়ে পাতলা করে খাওয়া যেতে পারে।”

২. ডায়াবেটিস রোগী

উচ্চ ফাইবারযুক্ত প্রোটিন যেমন ডাল, বাদাম, মাছ খাওয়া উপকারী। রেড মিট এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলতে হবে কারণ তা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়।

৩. হৃদরোগী

চর্বিহীন প্রোটিন যেমন মাছ, সয়াবিন, বিনস খাওয়া ভালো। রেড মিট ও ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলা জরুরি।

৪. আইবিএস (Irritable Bowel Syndrome) রোগী

আইবিএস রোগীদের জন্য রোজার সময় দুধজাত খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. খোকন।

৫. স্থূলতা

প্রোটিন পেট ভরা রাখে ও মেটাবলিজম বাড়ায়। গ্রিলড চিকেন, ডাল, লো-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার বেছে নেওয়া উচিত।

অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়ার ঝুঁকি

  • কিডনির ওপর চাপ: অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণে কিডনিকে বাড়তি বর্জ্য ছাঁকতে হয়
  • হাড় ক্ষয়: ক্যালসিয়াম নিঃসরণ বেড়ে হাড় দুর্বল হতে পারে
  • ওজন বৃদ্ধি: প্রোটিন ক্যালোরি সমৃদ্ধ, অতিরিক্ত গ্রহণে ওজন বাড়তে পারে
  • পানিশূন্যতা: প্রোটিন বিপাকে বেশি পানি লাগে, পানি না খেলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে

ডা. খোকন ইফতারে অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, “পুরান ঢাকার মানুষ ইফতারে প্রোটিন ও মাংসজাত খাবার বেশি খান। এখানে নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”

উপসংহার

প্রোটিন আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বয়স, ওজন, লিঙ্গ ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিমাণ ও উৎস বাছাই জরুরি। যাদের কিডনি, হৃদরোগ বা হজম সংক্রান্ত সমস্যা আছে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা ঠিক করা উচিত।